August 25, 2026, 9:56 am

৩১ সূচকের ১৯টিতেই অবনতি
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতিতে কিছু সূচকে অগ্রগতি হলেও সামগ্রিক চিত্রে উদ্বেগ রয়ে গেছে। অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ১২টিতে উন্নতি হয়েছে। বিপরীতে মূল্যস্ফীতি, মাথাপিছু ঋণসহ ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি হয়েছে। একই সময়ে দেশের তিনটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ছয় মাসের মূল্যায়নে এই দুই ক্ষেত্রেই আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং দুই ক্ষেত্রেই এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। তার মধ্যে ছিল তারল্য সংকট, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, অনাদায়ী ঋণ, অর্থ পাচার ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় সমস্যা। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অস্থিরতাও ছিল। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অর্থনীতিকে দ্রুত ঘুরে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি।
বিনিয়োগে স্থবিরতা, বন্ধ ৯৫ কারখানা
বেসরকারি বিনিয়োগে গতি না আসাকে অর্থনীতির অন্যতম বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখছে সিপিডি। সংস্থাটির পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক অবস্থা থেকে নেতিবাচক হয়েছে। কমেছে নিট বিদেশি বিনিয়োগও।
উৎপাদন খাতের পরিস্থিতিকে ‘শঙ্কাজনক’ হিসেবে উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক অবস্থায় চলে গেছে। এসব সূচকে দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর ফলে ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
রিজার্ভ বৃদ্ধিকেও সরলভাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন দেবপ্রিয়। তাঁর প্রশ্ন, রিজার্ভ বাড়া অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ, নাকি বিনিয়োগ ও আমদানি কমে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট এক ধরনের ‘রক্তশূন্যতার’ লক্ষণ। তাঁর ব্যাখ্যা, বিনিয়োগ না হওয়ায় আমদানি কমছে এবং এর প্রভাবেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে।
রাজস্ব আদায়েও উদ্বেগ
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জনকে কঠিন বলে মনে করছে সিপিডি।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজস্ব আদায়ের বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে না পারলে রাজস্ব আদায়েও কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরবে না।
সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন
অর্থনীতির পাশাপাশি সুশাসনের ক্ষেত্রেও সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট ও ‘মব কালচার’ বন্ধ করা ছিল সরকারের অন্যতম বড় অঙ্গীকার। কিন্তু বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন সীমিত বলে মনে করেন দেবপ্রিয়।
মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকলেও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে পদায়নের সমালোচনা করেন তিনি। একই সঙ্গে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও মব সহিংসতা অব্যাহত থাকা, নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় কার্যকর প্রতিরোধের ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ জানান।
গুম ও মানবাধিকার রক্ষায় প্রণীত আইনেও ত্রুটি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিশেষ করে আইন লঙ্ঘনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দিয়ে অনুসন্ধান করানোর ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনীতির দলিল হয়নি
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি না হওয়াকেও বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি।
দেবপ্রিয় বলেন, সরকার বারবার দাবি করছে যে তারা একটি খারাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের সময় অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা কী ছিল, তার একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করা হয়নি। ফলে এখন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কার্যকারিতা কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘আড়াই-তলা সরকার’
সরকারের কাঠামো নিয়েও মন্তব্য করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন পদমর্যাদার বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত বর্তমান সরকারকে তিনি ‘আড়াই-তলা সরকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তাঁর মতে, সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে বেশি জনপ্রিয়। সরকারের অনুমোদন বা জনপ্রিয়তার হারও ৫০ শতাংশের ওপরে থাকলেও বড় প্রশ্ন হলো—প্রধানমন্ত্রী তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে রাজনৈতিক সাহসের সঙ্গে নিজের দলের সদস্যদের সঠিক পথে পরিচালনা করতে এবং প্রশাসনকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারবেন কি না।
ছয় মাসের সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকার ‘এ’ করতে চাইলেও বাস্তবে অনেক সময় ‘বি’-এর দিকে চলে যাচ্ছে।
পে-স্কেল দ্রুত চূড়ান্ত করার তাগিদ
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখার সমালোচনাও করেছেন দেবপ্রিয়। তাঁর মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের রাজনৈতিক সাহসের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে সরকারের উদ্বেগ থাকতেই পারে। তবে বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা কমবে না; বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। অন্তর্বর্তী সরকার বেতন কাঠামো নিয়ে যে প্রতিবেদন দিয়ে গেছে, তা পর্যালোচনা করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশও ছিল।
দেবপ্রিয়র মতে, শুরুতেই ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে পরবর্তী সময়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে তা তুলনামূলকভাবে কার্যকর হতে পারত। এখন সিদ্ধান্ত আরও বিলম্বিত হলে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে।